সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত নিয়ে কিছু অবিশ্বাস্য কথা যা আমরা জানিই না ।

Rashed Rana

Author:

Total Comments: 985

Total: 144 Posts

Home » Islamic Forum » সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত নিয়ে কিছু অবিশ্বাস্য কথা যা আমরা জানিই না ।

ফাতহা শব্দের অর্থ সূচনা।

আল হামদুলিল্লাহ।

“আল হা’মদুলিল্লাহি রব্বিল আ’লামিন” সূরা ফাতিহা, আয়াত-১
“সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর, যিনি এই বিশ্ব জগতের মালিক। “

এই অনুবাদ কি সত্যিই সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করেছে? সঠিকভাবে?
চলুন এই আয়াত নিয়ে নতুন কিছু জেনে নিই।

এই টিউনে শুধু মাত্র আল হামদুলিল্লাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ আয়াতটির প্রথম অংশ নিয়ে।
“হামদ” শব্দের অর্থ আরবী ভাষায় ২টি জিনিস বোঝায়।
১. প্রশংসা
২. কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ

বেশিরভাগ অনুবাদেই হামদ শব্দের অর্থ করা হয়ে থাকে প্রশংসা। এটি ভুল নয়। তবে আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন, বলা হয়ে থাকে,  কুরআন কেবল মাত্র অনুবাদের মাধ্যমে অর্থ বোঝা সম্ভব না। 
কিন্তু কেন? জানেন কি সেটা?
আচ্ছা, কেমন হয় যদি এই অনুবাদ করা হয়,
“সমস্ত ধন্যবাদ একমাত্র আল্লাহকে, যিনি এই বিশ্বজগতের মালিক”
বেশ ভিন্ন ধরনের অনুবাদ, তাই না?
কিন্তু প্রশংসা এবং ধন্যবাদ দু’টি আলাদা জিনিস। তারা এক রকম নয়।
তাই যে আলোচনাটা প্রথমে করা উচিত, সেটি হল প্রশংসা এবং ধন্যবাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়!

ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে হাটছেন। আর একটা খুবই সুন্দর একটি গাড়ি দেখলেন। তখন আপনি কি করেন? প্রশংসা করেন? নাকি ধন্যবাদ দেন? আপনি এটার প্রশংসা করেন। ধন্যবাদ দেন না।

আবার

ধরুন আপনি এমন এক বাড়িতে গেলেন যেখানে খুবই সুন্দর একটি ছোট্ট বাচ্চা আছে। আপনি বাচ্চাটিকে তার সৌন্দর্যের জন্য কি ধন্যবাদ দেন? নাকি প্রশংসা করেন? প্রশংসা করেন, আশা করি আপনি তাকে ধন্যবাদ দেন না।

আর ধন্যবাদ একটি ভিন্ন জিনিস। আপনি সাধারণত তখনই কাউকে ধন্যবাদ দেন, যখন সে আপনার জন্য বা কারো জন্য ভালো কিছু করে। তাই আপনি যখন মনোমুগ্ধকর কিছু দেখেন, আপনি তার প্রশংসা করেন। আর যখন দেখেন আপনার জন্য কিংবা অন্য কারো জন্য কেউ কিছু করে, তখন আপনি তাকে ধন্যবাদ দেন।
যখন আপনি কারো প্রশংসা করেন, তার মানে এই না যে, আপনি তাকে ধন্যবাদও দেন। আবার আপনি যখন কাউকে ধন্যবাদ দেন, তার মানে এই না যে, আপনি তার প্রশংসাও করেন।

এটা নিয়ে চিন্তা করুন।

কিভাবে আপনি কাউকে ধন্যবাদ দিবেন প্রশংসা না করে? আসুন, কুরআন থেকেই উদাহারণ দেয়া যাক।

মূসা (আ) বেশ অদ্ভুত একটা পরিবারে বড় হয়েছে, একথা আপনারা অনেকেই জানেন। তিনি ফেরাউনের কাছে বড় হলেন। ফেরাউন তাকে সন্তান হিসেবে নিয়েছিলো। ফেরাউনই তাকে লালন-পালন করেছে।
আর অনেক বছর পর মূসা(আ) যখন ফিরে এলেন, তখন ফেরাউন তাকে বলেছিল, কি করে, কোন সাহসে তুমি আমার সাথে এমন করে কথা বলো? আমরাকি তোমাকে লালন-পালন করিনি?
তুমি কি কৃতজ্ঞ না? আর তখন মূসা (আ) বললেন, সেটাতো আমার প্রতি আপনার একটা অনুগ্রহ ছিলো। ধন্যবাদ। ” এটা ছিলো তার ধন্যবাদ দেওয়ার ধরন। অন্য ভাবে বললে, ফেরাউন কখনোই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য না।

তাহলে প্রশংসা ছাড়াও ধন্য বাদ জানানো সম্ভব।
আবার কুরআন বলছে, তোমরা পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। কিন্তু যদি তোমার পিতা মাতা শিরক করতে তোমাকে বাধ্য করে, তোমরা তার কথা শুনো না। কিন্তু আয়াতে শুরুতে বলেছেন যে, তবুও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হও।

আর আল্লাহ সূরা ফাতিহায় বলছেন যে, প্রশংসা আল্লাহর জন্যে। তিনি এটাও বলছেন কৃতজ্ঞতাও আল্লাহর জন্য। তিনি যেকোন একটার কথা বলছেন না। তিনি দুটোর কথাই বলছেন।

যদি আরবীতে বলা হয়,
“আল মাদ-হুলিল্লাহ”, এর অর্থ কি জানেন? এর অর্থ হচ্ছে, “প্রশংসা আল্লাহর জন্য”। অনুবাদ আগের মতোই আছে। কারণ “মাদ্দ” অর্থও প্রশংসা
আবার যদি বলা হয়,
“আস শুকরু লিল্লাহ”, এর অর্থ কি জানেন? এর অর্থ হচ্ছে, “কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্য”। কারণ “শুক্রু” অর্থও কৃতজ্ঞতা

কিন্তু আল্লাহ বলছেন, আল হামদুলিল্লাহ। এর অর্থ একি সাথে দুটোই।
তাহলে “মাদ্দ” আর “শুক্রু” থেকে “হামদ” কেন ভালো?

ধরুন আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন। আর আপনার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। রাস্তার পুলিশ ধরলো আপনাকে। আর আপনি বলছেন পুলিশকে যে, স্যার আপনাকে দারুন লাগছে, আপনার ড্রেসটায় খুবই সুন্দর মানিয়েছে আপনাকে।
আপনি তার প্রশংসা করছেন।
সেগুলো কি সত্যিকরের প্রশংসা? না।

আবার

ধরুন, আপনার পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। আপনি ফেল করলেন। আর বাসায় এসে বলছেন, মা তোমার রান্না আজ বেশ মজা হয়েছে। তোমাকে এই কাপড়ে বেশ ভালো লাগছে। তোমাকে খুব ভালোবাসি মা!
আপনি কি আপনার মার সত্যিকারেই প্রশংসা করছেন? না। আপনি তার মিথ্যে প্রশংসা করছেন, যেন তিনি আপনাকে পরীক্ষার ফলাফলের কথা জিজ্ঞেস না করেন।

তার মানে প্রশংসা মিথ্যেও হয়। মিথ্যে প্রশংসা করা হয় রাযাদের জন্যে। অফিসের বসদের জন্যেও মিথ্যে প্রশংসা করা হয়।
আবার প্রশংসা যে কেবল মিথ্যে হবে সব সময় তা নয়। আর প্রশংসাকে আরবীতে বলা হয় “মাদ্দ”, যেটা আসলে আল্লাহর জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত নয়।

এবার “শুক্রু” নিয়ে ভাবা যাক।

আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন, আর আপনার গাড়ির চাকা পানচার হয়ে গেল। আর নতুন চাকা লাগাতে কেউ আপনাকে সাহায্য করেছে। আপনি তাকে তখন ধন্যবাদ দেন। কিন্তু আপনাকে কে সাহায্য করেছে, সেটা যদি আপনি না জানেন, অথবা এমন হয়েছে যে, আপনার গাড়ির চাকা পানচার হয়েছে আপনি বলতেই পারবেন না, আপনি গাড়িতে ঘুমিয়ে আছেন বা অন্য কিছু, আপনাকে কেউ সাহায্য করেছে গাড়ির চাকা বদলে দিয়ে, তখন আপনিকি তাকে ধন্যবাদ দিবেন? না। কারণ ধন্যবাদ দেয়া জন্য কোনো কারণ থাকতে হবে। আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে ধন্যবাদ দিবেন না, যতক্ষন না আপনি বুঝবেন যে, সে আপনার উপকার করেছে।

আর আল্লাহ “শুক্রু” আর “মাদ্দ” ব্যবহার না করে কেবল “হামদ” ব্যবহার করেছেন। যার দ্বারা দুটো অর্থকেউ বোঝায়। আর শব্দ হিসেবে “হামদ” কেবল অকৃত্রিম ই হতে পারে। এটি তৈরি করা যায় না। এটি অকৃত্রিম প্রশংসা। এটি দ্বারা কোন মিথ্যে প্রশংসা বোঝানো হয় না। এটি কেবল আল্লাহর জন্যে। এটি কোনো প্রতিকৃয়াও না। এটা ‘আল মাদহুলিল্লাহ‘ বলার থেকেও বেশি শক্তিশালী। এটা ‘আস শুক্রুলিল্লাহ‘ বলার থেকেও বেশি শক্তিশালী।

তাহলে “আল হামদুলিল্লাহ” এর ধারণা বোঝাতে বাংলায় ২টি শব্দ লাগে। একটি হলো ধন্যবাদ, আরেকটি হলো প্রশংসা। তাহলে এখানে আমরা বুঝতে পারলাম অনুবাদের একটা কঠিনতম নীতি যে, কেন কুরআন বুঝতে অনুবাদ নয়, আরবী জানা দরকার। তবে আরবী না জানলে অন্তত অনুবাদ পড়তে পারেন। তবে সেটা দ্বারা পূর্ণ ভাব পাবেন না।

আচ্ছা, কি হতো আল্লাহ যদি ২টি শব্দই ব্যবহার করতো আল্লাহ?

আরবীতে “এবং” কথাটি বোঝাতে ব্যবহার করা হয় “ওয়া” শব্দ।

আল্লাহ যদি বলতেন
আল মাদ্দহু ওয়াশ-শুক্রুলিল্লাহ“, তাহলে কি হতো? এর অর্থ কি আল হুমদুলিল্লা-র মতো হতো?

আসলে না। হতো না। আরবী ভাষার একটা সুন্দর নীতির জন্য এটা একই রকম হতো না। আরবীতে বলা হয়ে থাকে একটা বাক্য “সব চেয়ে সুন্দর কথা সেটাই, যেটা অল্প কথায় পূর্ণ ভাব প্রকাশ করে

তাহলে “আল হামদুলিল্লাহ” বলা, “আল মাদ্দহু ওয়াশ-শুক্রুলিল্লাহ” বলার চেয়ে ভালো। তবে, এখানে আরো একটা পার্থক্য রয়েছে।

“এবং” এর আরবী শব্দ “ওয়া” শব্দটি আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ২টি জিনিস করে আলাদা করে। এবং কি অর্থের দিক দিয়েও।

যদি আপনি বলেন
আল মাদ্দহু ওয়াশ-শুক্রুলিল্লাহ” তার মানে আপনি বলছেন যে, আল্লাহর প্রশংসা কিছু জিনিসের জন্যে, আর কৃতজ্ঞতা অন্য কিছু জিনিসের জন্য। অর্থাৎ কখনো আপনি তার প্রশংসা করছেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে, আর কখনো আপনি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন প্রশংসা না করে।
কিন্তু আপনি যখন আল হামদুলিল্লাহ বলেন, তখন আপনি কৃতজ্ঞতা এবং প্রশংসা একই সময়ই একই সাথে প্রকাশ করছেন

আল হামদুলিল্লাহ কথাটি আমাদের ইতিবাচক ভাবতে সাহয্য করে।

যেমন: আপনার দিনটি খারাপ যাচ্ছে, আর কেউ আপনাকে জিজ্ঞেস করছে, কেমন যাচ্ছে আজকের দিনটা? তখন আপনি বললেন আল হামদুলিল্লাহ, ভালোই।

আসলেই কি আপনি কথাটা মন থেকে বলেছেন? আল্লাহর কাছে এটাই একমাত্র বিষয় না যে, আপনি মুখ দিয়ে কি বললেন। আল্লাহ আপনার অন্তরও দেখবেন। আপনি কি মন থেকেই বলেছেন কি না।

যেমন আপনি জ্যামে রাস্তায় পড়ে আছেন, আর নিজে নিজে বললেন আল হামদুলিল্লাহ! এমনটা ভাবা অবশ্য বেশ কঠিন। তবে, যখন আপনি আল হামদুলিল্লাহ বলবেন, তখন আপনি ইতিবাচক চিন্তা করতে শুরু করতে পারেন। আপনি ভাবতে পারেন যে, “হে আল্লাহ, এই জ্যামটা উপর থেকে হয়তো বেশ খারাপ লাগছে, কিন্তু হয়তো এই জ্যাম আমার জন্য মঙ্গল জনকই। আমি আপনার প্রশংসা করছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, কারণ আমি নিরাপদে আছি। আমার জন্য এই গাড়িটি আপাতত হলেও আছে, যা নিয়ে অন্তত জ্যামে আটকে থাকতে পারি। কিন্তু অন্তত গাড়িতো আছে।

তাহলে আল হামদুলিল্লাহ যেটা করে, তা হলো, একজন মুসলিমকে ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখায়।

একটু নড়ে চড়ে বসুন, আর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। না হলে নিচের কথা গুলো বুঝতে পারবেন না। 
আরবীতে আপনি কোন একটা বাক্য বলার সময় বিশেষ্য পদও ব্যবহার করতে পারেন। আবার ক্রিয়া পদও। আর ক্রিয়ার কাল আছে, যেমনঃ অতীত কাল, বর্তমান কাল, ভবিষ্যৎ কাল। বিশেষ্য পদের কোন কাল নেই। এখন মনে হচ্ছে ব্যাকরন শিখাচ্ছি। তবে ঠিক তা নয়।

ধরুন যদি বলি, আমি আল্লাহর প্রশংসা করি।

এখানে কি ব্যবহার করেছি? ক্রিয়া ব্যবহার করেছি। ক্রিয়ার জন্যে একজন কর্তা দরকার হয়, কাজটা করবে। আর এই বাক্যে বর্তমান কাল বোঝানো হয়েছে।

আর যদি বলি ‘প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্যে
এখানে ক্রিয়া ব্যবহার হয় নি। এখানে বিশেষ্য পদ ব্যবহার হয়েছে। যেটার কোনো কাল নেই।

যদি বলি আরবীতে, ‘নাহমাদুল্লাহ‘ মানে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করলাম

তার মানে আল্লাহর প্রশংসা আমরা করছি। যদি আমরা সেটা না করি, তবে সেই প্রশংসার অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে। “আমরা আল্লাহর প্রশংসা করলাম”, এখানে শুধু বর্তমান কাল বোঝানো হচ্ছে। অতীত বা ভবিষ্যতের কথা কিছুই বলা হচ্ছে না। এই ব্যাপারটাই পুরো বিষয়টাকে সৌন্দর্য মন্ডিত করেছে।

সূরা ফাতিহায় আল্লাহ আমাদের বলছেন না এখানে, যে তোমরা আল্লাহর প্রশংসা করো! তার মানে কি? আপনি জানেন? তিনি বলছেন “আল হামদুলিল্লাহ“, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। এখানে বিশেষ্য পদ ব্যবহার করা হয়েছে। তার মানে দাড়ায় আমি প্রশংসা না করলেও আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা। এটা আমার উপর নির্ভরশীল না। আমি আজ আছি, কাল নাও থাকতে পারি। কিন্তু আল্লাহর প্রশংসা সারা জীবনই থাকবে।

আরবের ভাষাতত্ত্ববিদগন বলে থাকেন যে, যোগাযোগ দুই ধরনের। একটি হলো অনুভূতির সাহায্যে। অন্যটি হলো তথ্যের সাহায্যে। যেমন: আমি আপনাদের আল হামদুলিল্লাহ নিয়ে কথা বলছি, এটি তথ্য বহুল কথা বার্তা।

ধরুন আপনি স্কুলে যাবেন। এখন মনে মনে দোয়া করছেন, “ইয়া আল্লাহ, আমি যেন স্কুলে গিয়ে একেবারে প্রথম সারিতে বসতে পারি। ” আর তাই জন্যে আপনি খুবই তাড়াতাড়ি স্কুলে গেলেন, এবং প্রথম সারি পেলেন বসার জন্যে। হয়তো এমন হয়েছে যে, স্কুলে এখনো কেউ ই আসেনি। আপনার আশে পাশ কেউ নেই। তখন আপনি বলে উঠলেন “আল হামদুলিল্লাহ”

আচ্ছা, আপনি কি এখানে “আল হামদুলিল্লাহ” অন্য কাউকে বোঝানের জন্য বলেছেন? না। আপনি “আল হামদুলিল্লাহ” দ্বারা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। আবেগ প্রকাশ করেন “আল হামদুলিল্লাহ” দিয়ে।

আবার যখন আমি আপনাকে আলহামদুলিল্লাহ কি, সেটা বোঝাচ্ছি, সেটা হলো তথ্য বহুল কথা বার্তা।

এটা নিয়েই চিন্তা করি।

আমরা মসজিদে খুতবায় শুনে থাকি, অনেক সময় খতিব সাহেব খুতবা শুরু করেন অনেকটা এভাবে,

ইন্নাল হামদালিল্লাহি. ” এভাবে।

এখন কথা হচ্ছে কেন খতিব সাহেব আল হামদুলিল্লাহ ছেড়ে কথার শুরুতে “ইন্না” শব্দটি যোগ করেন?
আরবী শব্দ “ইন্না” এর অর্থ বাংলায় “নিশ্চই/নিশ্চিতই/অবশ্যই
এটা নিয়ে একটু চিন্তা করি। কোনটা শুনতে বেশি জোরালো মন হচ্ছে?

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্ব জগতের মালিক
নাকি
নিশ্চই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্ব জগতের মালিক

কেনটা শুনতে বেশি জোরালো মনে হচ্ছে? ২য় টি। তাই নয় কি?

কথার শুরুতে “নিশ্চই” যোগ করাতে বেশি জোর প্রকাশ পাচ্ছে। তাহলে কেন আল্লাহ সূরা ফাতিহায় এই কথাটি বলেন নি?

কেন তিনি বলেন নি
ইন্নাল হামদালিল্লাহি রব্বিল আলামিন“?
কেন এটি বলেন নি?

সব কিছুর পরও সারা জীবনই শুনে আসছি যে কুরআন একেবারে পরিপূর্ণ, কিচ্ছু যোগ করতে পারবো না আমরা এতে।

তবে ছোট্ট করে “ইন্না” যোগ করে দিলে কিই হয়? খতিব সাহেবতো জুম্মাতে এটা করেই থাকেন।
যখন আপনি বলবেন “নিশ্চই যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য” তখন কথাটি কেবল একটিই তথ্য প্রকাশ করে। এটা অনুভুতি কে প্রকাশ করতে পারেনা।
খতিব সাহেব প্রতি জুম্মাতে এমন করেন, কারণ, তিনি আমাদের সাথে তথ্যবহুল বিভিন্ন কথা বলেন। তিনি অনুভুতি প্রকাশের জন্যে “হামদ” কথাটি তখন বলেন না, কারণ তিনি নিজে নিজে কথাটি বলছেন না, তিনি আমাদের লক্ষ করে কথা গুলো বলছেন।
“ইন্নি” বা “নিশ্চই” কথাটি এখানে আল্লাহ ব্যবহার না করে আল্লাহ “আল হামদুলিল্লাহ” কে এমন অর্থ করেছেন, যা আবেগও প্রকাশ করতে পারে, আবার তথ্যও। আমরা নিজেরা অনুভুতিতেও বলতে পারি, আবার অন্যের সাথে কথা বলার সময়ও ব্যবহার করতে পারি। সুবহানআল্লাহ!

এবার ২টি বাক্য দেখুন।

“আমি স্কুলে গিয়েছি”
“স্কুলে আমি গিয়েছি”
এদুটি বাক্যের মধ্যে কোনটা শুনতে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?
প্রথম বাক্যটি। তাই না?
হুম। ব্যাকরণ গত দিক থেকে দেখলে ১ম বাক্যটি ঠিক বাক্য। কিন্তু দুটির অর্থই আমরা বুঝতে পারছি। আরবীতেও এরকম শব্দের ক্রম পরিবর্তন হয়। তবে, তা বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে।

দেখুন তো একটু, আমরা যখন ঈদের নামাজে যাই, হেটে হেটে কি বলি? মন আছে? আমরা বলি
আল্লাহু আকবার, আল্লহু আকবার, আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ

খেয়াল করুন বাক্যটির শেষের দিকে (লাল করে লিখা), “ওয়ালিল্লাহিল হামদ“। আর সূরা ফাতিহায় একই শব্দগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে “আল হামদুলিল্লাহ“। তবে শব্দগুলোর ক্রমটা পরিবর্তন হয়েছে।

কিন্তু অর্থে কি পরিবর্তন হলো এতে? দুর্ভাগ্য জনক ভাবে এই সবগুলোর অনুবাদ প্রায় একি রকম করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি বিশেষ এক অর্থ প্রকাশ করে।

কুরআনে ৭ বার এসেছে এভাবে “আল হামদুলিল্লাহ”
আর কয়েকবার কুরআনেই আছে “লিল্লাহিল হামদ”।

তো যাই হোক, ফিরে যাই সেই ২টি বাক্যের দিকে।

“আমি স্কুলে গিয়েছি”
“স্কুলে আমি গিয়েছি”

২য় বাক্যটা অদ্ভুত শুনাচ্ছে একটু। কিন্তু আরবীতে  “শুধু” এই শব্দটা দরকার হয় না।

আমি স্কুলে গিয়েছি-বাক্যটা স্বাভাবিক।
স্কুলে আমি গিয়েছি“- এখানে আরবীর দৃষ্টি কোন থেকে আসলে যা বলছি, তা হলো “আমি শুধু স্কুলেই গিয়েছি, আমি সিনেমা হলে যাই নি, পার্কেও যাই নি শুধুই স্কুলে গিয়েছি। 
বোঝা গেল ব্যাপারটা?

আবার যদি বলি আমি শুধুমাত্র বাংলাদেশেই আসি নি.

এখানে বাক্যের আকাঙ্খা বাকি রয়ে গেছে। তবে বাক্যের বাকি অংশটা আপনি নিজেও পূরণ করে নিতে পারেন। অর্থৎ বাক্যটা দ্বারা বোঝানো হচ্ছে আমি শুধুমাত্র বাংলাদেশেই আসি নি, আমি ইন্ডিয়ায় এসেছি, সিঙ্গাপুরে এসেছি ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু আল্লাহ প্রায়ই কুরআনে বলছেন
“লিল্লাহিল হামদ” তার মানে দাড়ায়, “হামদ শুধু মাত্র আল্লাহর জন্যে, আর কারো জন্যে নয়। ”

আব এখানে আপনি যে বলছেন, হামদ শুধু মাত্র আল্লাহর জন্যে,
তার মানে দাড়ায় “এটি শুধুই আল্লহর জন্যে, অন্য কারো জন্যে নয়। 

কুরআনের ৪৫ নং সূরা, সূরা যাসিয়া। সূরাটির একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে, এটা একটা বিতর্ক। পরো সূরাটাই একটা বিতর্ক। শির্কবাদিদের সাথে বিতর্ক। সূরার শেষে আল্লাহ মুসরিকদের বলছেন, “লিল্লাহিল হামদ”। মানে, “হামদ শুধু মাত্র আল্লাহর জন্য, আর কারো জন্য না”

অন্যভাবে বললে “লিল্লাহিল হামদ” বলা হয় তাদের সাথে কথা বলার সময়, যারা আপনার সাথে এক মত না। তাই আমরা মুসলিমরা যখন কথা বলি, তখন আমরা বলি “আল হামদুলিল্লাহ”। কারণ আমাদের মুসলিমদের মধ্যে সে ধরনের কোন মতভেদ নেই। লা ইলাহা ইল্লাহ-এর ব্যাপারে আমরা একমত। এখানে বিতর্কের কোন দরকার নেই।
আর এভাবেই সূরা ফাতিহায় আল্লাহ তারপরিচয় আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি এই সূরার এই আয়াতে তারপরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি এটাকে কোন বিতর্কের বিষয় করে তুলে ধরেন নি।

এবার সূরার ফাতিহার ১ম আয়াতের বাকি অংশ নিয়ে জানা যাক।

আচ্ছা, কেন আল্লাহ সূরা ফাতিহায় নিজেকে আল্লাহ বলেছেন তথা নিজেকে নিজের নাম ধরে ডেকেছেন?

কোন নবীকে যাদুকরের সাথে লড়তে হয়েছে? মূসা (আ) কে। মূসা(আ) যাদুকরদের মুখোমুখি হলেন। যাদুকররা ফেলল তাদের দড়ি আর লাঠি। মূসা(আ) ফেললেন তার লাঠি। মূসা(আ) এর লাঠি বাকিদের লাঠিগুলোকে খেয়ে ফেললো। যাদুকরেরা সিজদায় পড়ে গেলো। ফেরাউন মঞ্চে দাড়ানো। সে বুঝে উঠতে পারছে না যে এরা কি করছে! সে যাদুকরদের জিজ্ঞেস করলো যে, তোমরা কি করছো? এটা কি? বা এটাকি যাদুরই অংশ? নাকি তোমরা ২য় পর্বের জন্য প্রস্তুত হচ্ছো? তারা সিজদা থেকে উঠে বললো, আমরা বিশ্বাস আনলাম রব্বিল আলামিনের উপর। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে ফেরাউন এখনো দ্বিধান্বিত। সে বললো, ও আচ্ছা বুঝেছি। তোমরা আমার কথাই বলছো। তখন তারা বললো, না আমরা তোমার কথা বলছি না। আমরা বলছি মূসার(আ) রব, আর হারুনের(আ) রব। যখন তারা বললো “আমরা বিশ্বাস আনলাম রব্বিল আলামিনের উপর” তখন ফেরাউনের কোন সমস্যা ছিলো না। তাই ব্যাপারটা পরিষ্কার করার জন্য তাদের বলতে হয়েছে যে, আমরা মূসা আর হারুনের রবের উপর ঈমান আনলাম।

এর মানে হলো যদি কেউ কোন রবের কথা বলে, তখন তাকে স্পষ্ট করতে হবে যে, সে রব কে। তাই আল্লাহ সূরা ফাতিহায় নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ শব্দটি দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন যে, এখানে কোন রবের কথা বলা হচ্ছে। তবে আরো একটা চমৎকার ব্যাপার আছে

যখন আমরা কোন একটা কাজের জন্য কাউকে ধন্যবাদ দিই, হোক কোন চিত্র কর্মে জন্য, বা কোন ভালো কিছু করার জন্য, তখান আমরা তাকে ধন্যবাদ দিই কেবল মাত্র সেই চিত্র কর্ম বা সেই ভালো কাজটি কারার জন্য। আবার যখন বসন্তের বাতাসের আমরা প্রশংসা করি, তখান আমরা বাতাসের যে গুনের জন্য তার প্রশংসা করি, তা হল মিষ্টি নাতিশীতোষ্ণতার জন্য। কারণ আমরা এটা অনুভব করেছি। তাই বলাবাহুল্য যে এভাবে ধন্যবাদ এবং প্রশংসা খুবই সীমিত। প্রশংসা এবং ধন্যবাদ দেয়ার জন্য তাই কিছু করণ থাকতেই হয়।

তাই আপনি যদি বলেন
“আল হামদুলিল খালিক”
সমম্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ সৃষ্টিকর্তার প্রতি।

তখন আপনি সৃষ্টিকর্তার যে গুনটির জন্য প্রশংসা করছেন, তা আসলে শুধু মাত্র তাঁর সৃষ্টির জন্যে।

আবার আপনি যদি বলেন
“আল হামদুলিল হাকিম”
সমস্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ মহা প্রজ্ঞাময়ের জন্যে

আপনি এখানে তার প্রশংসা করছেন এবং ধন্যবাদ দিচ্ছেন যে গুনটির জন্যে, তা হচ্ছে তাঁর প্রজ্ঞা।

এগুলো মানতে কোন সমস্যা নেই। তবে এগুলো কুরআনের আয়াত না। 
তাহলে এই নিয়মে আল্লাহর প্রত্যেকটি গুনের জন্যে প্রশংসা করা সম্ভব হচ্ছে না।

আমি কি করে আল্লাহর সব গুনের জন্যে প্রশংসা করতে পারি? যা আমি চিন্তা করতে পারি, যা আমি চিন্তা করতে পারি সা, সব কিছু এক বাক্যের মাধ্যমে কিভাবে তার প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি? মাত্র একটাই উপায়ে। সেটা হচ্ছে আল হামদুলিল্লাহ

আচ্ছা, আল্লাহর কত গুনবাচক  নাম আছে? কমপক্ষে ৯৯টি। আল্লাহ সবগুলো থেকে বেছে ১টাই বেছে নিলেন প্রথমবারের মতো আমাদের কাছে তারপরিচয় দিতে। সেটা হচ্ছে “রব“।
আল্লাহ বলছেন, “আল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন”

আর আল্লাহ যে আমাদের রব, এটাই তার ব্যাপারের আমাদের প্রথমেই জানা উচিত।

ব্যাপরটা একটু চিন্তা করে দেখি।

রব মান কি? ছোট থেকেই পড়ে আসছি, আল্লাহ আমাদের রব। কিন্তু রব এর মানেটা আমরা কয়জনেই জানি? তাই এটা নিয়ে একটু আলোচনা করা উচিত।

রব শব্দটি বেশ জটিল। আরবেরা বলে, রব মানে আল মালেক, আল মুরব্বি, আল মুন’ইন, ওয়াল ক’ইয়েম, আস সাইয়েদ।

একটা একটা করে বলছি। আশা করি বুঝতে পারবেন। 
প্রথমত রব হচ্ছেন তিনিই যিনি কোন কিছু মালিকানা অধিকার করেন। এটা হচ্ছে রবের প্রথম অর্থ। ভালো কথা। তিনি যদি সব কিছুর মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে আমরা কি হচ্ছি? অধিকৃত সম্পত্তি। আমরা তার অধিকৃত সম্পত্তি। এটাই হচ্ছে রবের প্রথম অর্থ। আল মালেক

দ্বিতীয়টি হচ্ছে আল মুরব্বি। মুরব্বি হচ্ছেন তিনি, যিনি তার অধিকৃত সম্পত্তির ক্রম-বিকাশকে নিশ্চিত করেন। যিনি দেখভাল করেন কোন কিছুর, যাতে তা বিকোশিত হয়।

এমন কি হয়? যে, আপনার এমন কিছু আছে যা আপনি দেখভাল করেন না। হয়তো আপনার একটা গাড়ি আছে, আপনি সেটা ফেলে রেখেছেন, তেল পরিবর্তন করেন না। আপনার একটা কম্পিউটার আছে, কিন্তু আপনি এর ফাইল গুলোকে গুছিয়ে রাখেন না। আপনি অনেক কিছু একসাথে ডাউনলোড করে রাখেন। এর সাথে একটা ভাইরাসও চলে এলো। কিন্তু আপনি এর জন্য অ্যান্টি ভাইরাস ব্যবহারও করছেন না। এমনটা হয় কি কখনো? আপনার একটা বাগান আছে, কিন্তু আপনি এর যত্ন করেন না। বাগানে কত উদ্ভট গাছ জন্মাচ্ছে, আপনি এর পরিচর্যা করেন না। এরকম প্রায় ই হয়ে থাকে। হতেই পারে।

কিন্তু মুরব্বি হচ্ছেন এমন কেউ, যিনি কোন কিছু মালিকানার অধিনেও আছেন। আবার সব কিছু ঠিক ভাবে চলছে কিনা, তা নিশ্চিতও করেন। এটাই হচ্ছে মুরব্বি।

এবার তৃতীয়টি। আল মুন’ইন। এটি হচ্ছে এমন কেউ, যিনি আপনার উপর মালিকানা রাখেন, দেখভাল করেন এবং উপহারও দিয়ে থাকেন।

এখন উদাহারন স্বরূপ, আপনার একটা ছাগল আছে। আপনি এর দেখাশুনা করেন। কিন্তু আপনি তো একে উপহার দেন না। আপনার ছগল কি পছন্দ করে বা অপছন্দ করে, সে অনুযায়ী তাকে বিভিন্ন উপহার দেন না আপনি তাকে। আপনি আপনার ছাগলের মন মতো উপহার দিতে পারেন না। সেটা মুরব্বি নয়।

ওয়াল কা’ইয়েম। ইনি হচ্ছেন তিনি, যিনি মালিক, উপহার দেন, এবং নিশ্চিত করেন, তা যেন অক্ষত থাকে। তিনি যদি সেটার দেখভাল না করেন, তবে তা নষ্ট হয়ে যাবে।

আমাদের অনেকেরই বাগান আছে। বাগানে প্রায় ই কিছু স্পর্শকাতর উদ্ভিদ জন্মে। যদি কয়েকটা দিন এটির যত্ন না নেয়া হয়, তবে তা নষ্ট হয়ে যাবে। ইনিই হচ্ছেন তিনি, যিনি অস্তিত্ব রক্ষা করেন। তিনি যদি এক সেকেন্ডের জন্য, আধা সেকেন্ডের তার দায়িত্বটি বন্ধ করেন, তাহলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। সব। আমার রক্ত সঞ্চালন থেকে শুরু করে হার্টবিট, তিনি যদি এগুলোর প্রতি অতি সামন্য সময়ের জন্যেও লক্ষ না রাখেন, সব শেষ হয়ে যাবে। এর মানে হচ্ছে আমরা পুরোপুরি আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। এটাই হচ্ছে কা’ইয়েম।

শেষ অর্থটি হচ্ছে আস সাইয়েদ। এর মানে হলো যার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। এটা কি সম্ভব, যে আপনার কোন কিছু রয়েছে, কিন্তু পূর্ণ কতৃত্ব নেই? আপনার গাড়ি আছে, কিন্তু আপনি যেভাবে খুশি তা চালাতে পারেন না? আপনি বাড়ি বানাবেন, কিন্তু যেভাবে ইচ্ছা খুশি তা বানাতে পারবেন না? আপনাকে কিছু নিয়ম নীতি মেনে সেগুলো পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু যখন কারো কিছু থাকে এবং সে সম্পত্তির উপর তার যা খুশি তা করার ক্ষমতা থাকে, তখন তাকে বলা হবে আস সাইয়েদ।

আল্লাহ সূরা ফাতিহায় আমাদের এই রব শব্দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রব হচ্ছেন তিনি, যিনি প্রতি নিয়ত আপনার দেখভাল করছেন। তিনি এমন না যে তিনি আপনার মালিক অথচ তিনি আপনার দেখভাল করছেন না। তা যদি হতো, তাহলে তিনি আর রব থাকতেন না। কিন্তু আল্লাহ সূরা ফাতিহায় বলছেন, তিনি এই নিখিল জাহানের রব। তিনি আপনাকে উপহারও দেন।

চিন্তা করুন তো, আপনিকি কোন কিছুর মালিক? কোন কিছুর? আপনার চোখ দুটোর মালিক আপনি নিজে? বা কোন জমির মালিক? আপনি আপনার হাতের জন্য টাকা দেন? চোখের জন্য? কত টাকার বিনিময়ে আপনি হাতের একটা আঙ্গুল বিক্রি করতে চাইবেন? কত টাকার বিনিময়ে? সুবহানআল্লাহ! প্রথমত আমরা কোন কিছুর মালিক নই। তাহলে আমরা যা কিছু পাই, সবই তাঁর উপহার।

আমি বেচে আছি এজন্যে না, কারণ আমি নিয়মিত ব্যায়াম করি, স্বাস্থকর পরিবেশে নিশ্বাস নিই। না। এগুলো আমাদের বেচে থাকার করণ না। এরকম অনেকেই আছেন যাদের বয়স খুব কম, খুব ভালো স্বাস্থের অধিকারী, কিন্তু বেশি দিন পৃথিবীতে থাকতে পারে নি। এগুলো আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। পুরোটাই। এই কথাগুলো ভেসে আসছে রব শব্দটি থেকে।

আচ্ছা এবার আরেকটু সামনে আসি।
যখন বলা হয় মা-বাবা, তখন এই শব্দের সাথে অন্য আরেকটি শব্দ সম্পর্কিত। সেটা হলো সন্তান
যখন বলা হয় শিক্ষক, এর সাথে সম্পর্কিত ছাত্র। 
যখন বলা হয় বস, এর সাথে সম্পর্কিত কর্মচারি
আবার এমন শব্দও আছে যার সাথে অন্য কোন শব্দের সম্পর্ক নেই। যেমন: আকাশ, বাতাস, পানি ইত্যাদি।

আল্লাহর এমন কিছু নাম আছে, যেগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্কে নেই।

আবার এমন নামও আছে, যেগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক আছে। যেমন: তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, আমরা তার সৃষ্টি

সূরা ফাতিহায় আল্লাহ নিজেকে রব বলেছেন। আর আমরা তার অধিকৃত সম্পত্তি আগেই বিবরণ দিয়েছি। অর্থাৎ আমরা তার দাস। আর দাস কে আরবীতে বলা হয় ‘আব্দ’

যদি ফাতিহার একটু সামনে যাই,
ইয়া কানা’ বুদু.
আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি.

আমরা ইতি মধ্যেই তাঁকে রব হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছি, এবং নিজেদের আব্দ হিসেবেও।

দাসের স্বাধীন কোন ইচ্ছা নেই। সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না। তার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে দিতে হয়।

মনে করুন একজন লোকের একজন দাস আছে। লেকটি তার দাসকে প্রথম দিন বললো, এই ছেলে, আজ থেকে তুমি আমার দাস। সে উত্তর দিলো ঠিক আছে। তারপর লোকটি তার দাসকে কোন কাজ করতে বলে নি। তাই তার দাসও কিছু করছে না। যদি দাসের প্রভু কোন আদেশ না দেয় দাসকে, তখন সে দাসের যা করার থাকে, তা হলে নিজের ইচ্ছে মতো চলা যতক্ষন না প্রভু কোনো কিছু আদেশ দেন।

একজন দাস আর কর্মচারির মধ্যে পার্থক্য কি? একজন কর্মচারি কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে নিযুক্ত। কিন্তু একজন দাস সব সময়ই দাস। সে সকালেও দাস, বিকেলেও দাস। ঘুমের মধ্যেও দাস, জেগে থাকতেও দাস। রাতেও দাস, দিনেও দাস। সব সময়ই দাস। এমন কোন সময় নেই, যে সময় সে দাস নয়!

কিন্তু সে যেহেতু একজন দাস, তাই তার যা করার থাকে তা হলো প্রভুর ইচ্ছা মতো কাজ করা। কিন্তু প্রভু যদি দাসকে কোন আদেশ না করে, কিংবা দাস যদি না জানে যে, তার প্রভু কি চায়, তাহলে সে দাস তখন সেটাই করতে থাকবে, যা দাস নিজে চায়। কারণ তার প্রভু তাকে কোনো আদেশ দেয় নি। আর যখন থেকে দাস নিজের ইচ্ছ মতো কাজ করা শুরু করে, সংজ্ঞা অনুযায়ী সে মুক্ত। তাই দাসত্ব বলতে কিছু নেই ততক্ষন পর্যন্ত, যতক্ষন না তার প্রভু তাকে কিছু করতে বলেন।

এখন আমরা আমাদের দাস আর আল্লাহকে রব বল মেনে নিচ্ছি। এটা আমাদের ভাবাবে। যদি আমি দাস হই, তাহলে আমাদের কি প্রয়োজন? দিক নির্দেশনা। সূরা ফাতিহায় এমনটা কি আছে যে, আমরা আল্লাহ থেকে দিক নির্দেশনা চাচ্ছি? ৫ নং আয়াতে এমন টা হচ্ছে
“ইহ দিনাস সিরাতাল মুসতাকিম”, 
আমাদের সরল পথ দেখাও। 
রব এবং দাস এর মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে। তাই কুরআনের অনেক জায়গায়, আল্লাহ যখন রবের কথা বলছে, ঠিক তখনি “আব্দ” বা দাস (আমাদের) কথা বলছে।

রব এবং আব্দ। এদের সম্পর্ক আছে। দাস যদি তার প্রভুকে না মানে, তাহলে ঠিক দাস বলা যায় না। কেননা যে দাস যে মুহুর্তে তার প্রভুর কথা মানে না, অন্তত সে মুহূর্তে সেই দাস নিজেকে দাস হিসেবে মানছে না। এবং তার প্রভুকেও প্রভু হিসেবে মানছে না।

তো সূরা ফাতিহায় আমরা দেখলাম কিভাবে আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর পরিচয় দিয়েছেন, এবং আমরা নিজেদের দাস বলে মনে নিয়েছি। তিনি আমাদের রব তখনি, যখন আমরা তার দেয়া দিক নির্দেশনা মেনে চলবো। অন্যথায় আপনি হয়তো তাকে আপনার স্রষ্টা হিসেবে মেনে নিয়েছেন, আপনার সৃষ্টি কর্তা হিসেবে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু আপনি তাকে প্রভু হিসেবে মেনে নেন নি। কারণ তাকে প্রভু হিসেবে মানতে হলে আপনাকে দাস হিসেবে নিজেকে মানতে হবে। আর দাস হিসেবে মানতে হলে আপনাকে আল্লাহর দেয়া দিকনির্দেশনা গুলো মেনে চলতে হবে। আর দিকনির্দেশনা মেনে না চলার অর্থ হলো আপনি আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মেনে নেন নি। অনেকে ব্যাপারটাকে ছোট করে দেখেন, অনেকে আবার দেখেন ই না, অনেকে ভাবে, “ও, তিনি আমার সৃষ্টি কর্তা!”  আল্লাহ আপনাকে সেটা মানার আগে মানতে বলেছেন আল্লাহকে রব হিসেবে গ্রহন করতে এবং নিজেকে দাস বা বান্দা হিসেবে গ্রহন করতে।

এবার শেষ বিষয়। আয়াত টির শেষ অংশ।

“আল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আ’লামিন

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগৎ সমুহের প্রভু।

আ’লামিন নিয়ে কিছু বলি। আ’লামিন অর্থ অনুবাদ করা হয় “জগৎ সমূহ
জগৎ সমূহের শব্দটার সমস্যা হচ্ছে যে, আ’লামিন শব্দের খুব একটা ভালো অনুবাদ নয়। 
জগৎ সমূহের বোঝাতে যে শব্দটা আরবীতে ব্যবহৃত হয়, সেটি হচ্ছে “আ’ওয়ালেম“, “আ’লামিন” নয়।

আ’লামিন বলতে আরবীতে মূলত যা বোঝানো হয়, তা হলো মানুষ আছে এমন জগৎ। আল্লাহ এখানে যা বোঝাচ্ছেন, তা হলো ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্ম। এজন্য আল্লাহ বনি ইসরাইল দের বলছেন, “আমি তোমাদের সম্মানিত করেছি অন্য সকল জাতির উপর” এখানেও একই শব্দ ব্যাবহৃত হয়েছে। “আ’লামিন”

প্রতিটি জাতিকে একেকটি জগৎ বলা হয়েছে। প্রতিটি প্রজন্মকে একেকটা পৃথিবী বলা হয়েছে।
যদি কোন প্রবীনক জিজ্ঞেস করেন যে, আপনাদের ছোটকালে জীবন-যাত্রা কেমন ছিলো! সে বললো, “ওহ, সে এক ভিন্ন জগৎ” শুনেন নি এমটা কখনো?

আমরা বাংলাদেশি। যদি সৌদি আরবে যাই। বা অ্যামেরিকায় যাই, মনে হবে “ওহ এ এক ভিন্ন দুনিয়া”।

এই আ’লামিন কথাটার অর্থ হচ্ছে ভিন্ন সংস্কৃতি, তারা ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা।

আর আল্লাহ বলছেন, তারা যে সংস্কৃতিরই হোক, যে সভ্যতারই হোক, আমি তাদের সকলের প্রভু।
এই আয়াতে আল্লাহ আরো বোঝাচ্ছেন, আল্লাহই এই সকল বিচিত্র সংস্কৃতির স্রষ্টা। আল্লাহই হচ্ছেন এই সকল বিচিত্র সভ্যতার স্রষ্টা, বিচিত্র ভাষার স্রষ্টা। তিনিই হচ্ছেন এই সব কিছু প্রভু। তাই আপনাকে বাকিদের মতো হতে হবে না। আপনি নিজের সক্রিয়তাতেই থাকুন। আল্লাহ বলছেন না আমাদের আরবদের মতোই হতে হবে। ইসলাম এমনটা চায় না। ইসলাম প্রতিটি সংস্কৃতির উপরই শ্রদ্ধাশীল। আল্লাহ বলছেন তিনিই এই বিচিত্র সংস্কৃতির স্রষ্টা। আপনি শুধু সত্যের পথে থাকুন। ব্যাস। যতক্ষণ আপনি সত্যের পথে থাকছেন, আপনি সুখি হতে পারবেন। তা যে সংস্কৃতিরই হোক, যে ভাষার ই হোক না কেন বা যে সভ্যতারই হোক না কেন। তারা সকলেই আল্লাহর কাছে সম্মানিত। চমৎকার ব্যাপার।
রব্বিল আলামিনের আরেকটা ব্যাপার, যে আমরা সবাই তার দাস। যে ভাষার কিংবা সভ্যতারি হই না কেন। কেউ কারো উপর শ্রষ্ঠত্বের দাবিদার নয়। তিনিই রব, যিনি সব কিছুর দেখাশুনা করেন। তিনি আমাদের সবার রব আর আমরা সবাই তার দাস। তাহলে কেন আমরা একে অন্যে উপর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই করবো? বাহ! কি চমৎকার।

এই হলো সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত নিয়ে অতি সামন্য কিছু কথা। এভাবে লিখতে শুরু করলে সারা দিনেও শেষ করা যাবে কি না, নিশ্চয়তা নেই। উপরের কথা গুলো নোমান আলী খানের লেকচার থেকে নেয়া হয়েছে। আমরা কুরআন বুঝতে চেষ্ট করবো। অনুবাদ দিয়ে কুরআনের অর্থ বোঝা যায় না। তাই চেষ্টা করতে হবে আরবী শিখার জন্যে। জাজাকাল্লাহ।

Leave a Reply